কঙ্কাল দ্বীপ (চার)
৪
দশ মিনিট পর পাহাড়ের মাথার কাছে উঠে এলো
ওরা। পাহাড় না বলে বড় টিলা বলাই উচিত। কিন্তু নাম
পাহাড়, জলদস্যুর পাহাড়।ঠিক চূড়ার কাছে গুহামুখ,খুদে
একটা আগ্নেয়গিরি যেন। ভেতরে উঁকি দিল তিন
গোয়েন্দা। অন্ধকার।
ভেতরে পা রাখল ওরা। তেরছাহয়ে নেমে
গেছে সুড়ঙ্গ। সুড়ঙ্গ পেরিয়ে একটা গুহায় এসে
ঢুকল তিন কিশোর। বেশ বড় হলরুমের মত গুহা।
লম্বাটে।
শেষ প্রান্তটা সরু। সুড়ঙ্গ দিয়ে আলো এসে
পড়ছে, গুহার ভেতরে আবছা অন্ধকার।
গুহার মাটি আলগা, হাঁটতে গেলে পা দেবে যায়।
অসংখ্যবার খোঁড়া হয়েছে প্রতিটি ইঞ্চি, তার
প্রমাণ।
নিচু হয়ে একমুঠো মাটি তুলে নিলো কিশোর।
আঙুলের ফাঁক দিয়ে ছাড়তে ছাড়তেবলল,
কিশোর পাশা: “গুপ্তধন খুঁজেছে লোকে। গত
সোয়াশোবছরে কয় সোয়াশো বার খোঁড়া
হয়েছে এখানকার মাটি, আল্লাই জানে ! সব গাধা !
এমন একটা খোলা জায়গায় এনে গুপ্তধন লুকিয়ে
রাখবে, জলদস্যুদের এত বোকা ভাবল কি
করে !”
মুসা আমান: “ঠিক,”
মাথা ঝাঁকাল মুসা। আঙুল তুলে সরু প্রান্তটা দেখিয়ে
বলল,
“ভেতরে আরও গুহা আছে মনে হচ্ছে ! টর্চ
আনলে ঢুকতে পারতাম।”
কিশোর পাশা:”গোয়েন্দাগিরি করছ, গুহায় ঢুকতে
এসেছ, টর্চ আননি কেন ?”
হাসল কিশোর। রবিনের দিকে ফিরল,
“তুমি এনেছ ?”
মুসা আমান: “গুহায় ঢুকব, ভাবিনি।”
রবিন মিলফোর্ড: “আমিও ভাবিনি।”
কিশোর পাশা:”গোয়েন্দাদের জন্যে টর্চ একটা
অতি দরকারি জিনিস, সব সময় সঙ্গে রাখা উচিত,”
আবার হাসল কিশোর।
“তবে, আমিও রাখতে ভুলে যাই। আজ গুহায় ঢুকব,
জানি, তাই মনে করে সঙ্গে নিয়ে এসেছি !”
গুহার সরু প্রান্তে এসে দাঁড়াল ওরা। টর্চ
জ্বাললকিশোর। পাথুরে দেয়াল। দেয়ালে অসংখ্য
তাক, প্রাকৃতিক। মসৃণ। এখানেই ঘুমাত হয়ত জলদস্যুরা,
ঘষায় ঘষায় মসৃণ হয়ে গেছে। কে জানে,
বন্দিদেরকে হয়ত হাত-পা বেঁধে এখানেই
ফেলে রাখা হত ! অসংখ্য ফাটল, খাঁজ দেখা গেল
দেয়ালের এখানে ওখানে। একপাশে, মাটি
থেকেফুট ছয়েক উঁচুতে একটা খাঁজে এসে
স্থির হয়ে গেলটর্চের আলো। সাদা একটা বস্তু।
ওপরের দিকটা গোল।
মুসা আমান: “খাইছে রে !”
চেঁচিয়ে উঠল মুসা। ঘুরে দাঁড়িয়েই ছুট লাগাতে
গেল।
তারপরেই ঘটল অদ্ভুত একটা কাণ্ড ! চমকে
থেমে গেল সে।
তাকের ওপর বসে আছে যেন মানুষের মাথার
খুলিটা। চক্ষু কোটর দুটো এদিকে ফেরানো।
দাঁতগুলো বীভৎস ভঙ্গিতে হাসছে নীরব
হাসি,দুই পাটি দাঁতের মাঝে সামান্য ফাঁক। ওই ফাঁক
দিয়েই এলো যেন কথাগুলোঃ
–“ভাগ, ভেগে যাও জলদি !”
দী-র্ঘ-শ্বা-স . . .
“আমাকে শান্তিতে একা থাকতে দাও ! এখানে
কোন গুপ্তধন নেই !”
পাপালো হারকুস: “তারপর ?”
খুলিটা পেছনে ছুঁড়ে ফেলে দিল পাপালো
হারকুস।
“চিনতে পার ?”
কিশোর পাশা: “নিশ্চয়। প্রথমে দৌড় দিয়েছিলাম,
তারপরই মনে হল গলাটা কেমনচেনা চেনা। টর্চ
তুলে নিতে আসার সাহস করেছি সেজন্যেই।”
পাপালো হারকুস: “তারমানে,ভয় পাইয়ে দিতে
পেরেছি তোমাদের ?”
আবার হাসল পাপালো।
“জলদস্যুর ভূত ভেবে কি একখান কাণ্ডই না
করলে !”
মুসা আর রবিনের গোমড়া মুখের দিকে চেয়ে
আবার হা হা করে হেসে উঠল সে।
কিশোর পাশা: “আমি ভয় পাইনি,”
গম্ভীর গলায় বলল কিশোর।
“শুধু চমকে গিয়েছিলাম। মুসা আর রবিন . . . ”
দুই সহকারীর পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে থমকে
গেল সে। ভেড়া বনে গেছে যেন মুসা আর
রবিন।
রবিন মিলফোর্ড: “আমিও ভয় পাইনি,”
বিড়বিড় করল রবিন।
“পা দুটো কথা শুনল না, কি করবে ! খালি ভাগিয়ে
নিয়ে যেতে চাইল . . . ”
মুসা আমান: “আমারও একই ব্যাপার ! খুলির ওদিক
থেকে কথা শোনা যেতেই পা দুটো চনমন
করে উঠল। ছুটিয়ে বের করে নিয়ে
যেতেচাইল গুহার বাইরে। তাই, ইচ্ছে করেই
তো হোঁচট খেলাম . . . ”
হো হো করে হেসে উঠল পাপালো।
পাপালো হারকুস: “দারুণ কৌতুক ! হাঃ হাঃ হাঃ . . . ”
কিশোরও হেসে ফেলল। হাসিটাসংক্রমিত হল মুসা
আর রবিনের মাঝেও।
রবিন মিলফোর্ড: “দু’ডলারেদু’জন মানুষের খাওয়া
হয়!!”
চোখ কপালে উঠল রবিনের।
“বেঁচে আছ কি করে ?”
পাপালো হারকুস: “আছি, কোনমতে,”
সহজ গলায় বলল পাপালো।
“পুরানো ভাঙা একটা কুঁড়েঘরে ঘুমাই। এক সময়
ঝিনুকরাখত ওখানে জেলেরা। কাজে লাগে না
এখন, ফেলে রেখেছে। ভাড়া দিতে হয় না
আমাকে। সীম আর রুটি কিনতেই খরচ হয়ে যায়
দু’ডলার। মাছ ধরতে জানি, তাই বেঁচে আছি। বাবা
অসুস্থ। ভাল খাওয়া দরকার। কিন্তু কোথায় পাব?
মাঝে মাঝে বাবার কষ্ট দেখলে আর সইতে পারি
না। ছুটে বেরিয়ে আসি কুঁড়ে থেকে। পাগলের
মত ঘুরে বেড়াই উপসাগরে, খুঁজে ফিরি সোনার
মোহর। মানুষেরদয়া আমি চাই না, ঈশ্বর আমাকে
সাহায্য করলেই যথেষ্ট।”
অনেকক্ষণ কেউ কোন কথা বলতে পারল না
আর। নোনাপানি ছুঁয়ে ছুঁয়ে আসছে হাওয়া, শাঁই শাঁই
শব্দ, সাগরের দীর্ঘশ্বাস যেন।
কোমরের বেল্টে গোঁজা ছুরিখুলে নিয়ে
খামোখাই মাটিতে গাঁথছে পাপালো। থমথমে
পরিবেশ হালকা করার জন্যে হাসল।পাপালো হারকুস:
“নিজের দুঃখের সাতকাহনই গেয়ে চলেছি !
আসল কথা থেকে দূরেসরে গেছি অনেক।
হ্যাঁ, কি যেন জিজ্ঞেস করছিলে ?”
মুসা আমান: “গতরাতে এত তাড়াতাড়ি আমাদেরকে
খুঁজে পেলে কি করে ?”
পাপালো হারকুস: “সকালে হাক স্টিভেনের
ওখানে বাসনমাজছিলাম। হঠাৎ কানে এলো,হাসাহাসি
করছে কয়েকজন লোক। একজন বললঃ
গোয়েন্দা, না ! গোয়েন্দা আনাচ্ছে ! আসুকনা
আগে ! হাত দেখিয়ে ছাড়ব ব্যাটাদের !”
নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটতে কাটতে হঠাৎ
থেমে গেল কিশোর।
কিশোর পাশা: “হাত ! শব্দটাকোন বিশেষ
ভঙ্গিতে উচ্চারণ করেছিল ?”
পাপালো হারকুস: “তুমি কি করে বুঝলে ! ওই
শব্দটা বলার সময় জোর দেয় সে। ঝড়ের সময়ই
তোমাদের নিরুদ্দেশের খবর ছড়িয়ে পড়ল।
বুঝে গেলাম, কোথায়পাওয়া যাবে
তোমাদেরকে।”
কিশোর পাশা: “দ্য হ্যাণ্ড. . . হস্ত. . . হাত,”
বিড়বিড় করল কিশোর। চিমটি কাটছে ঠোঁটে।
পুরানো গলাবন্ধ শার্টের তলায় হাত ঢোকাল
পাপালো।
পাপালো হারকুস: “আমাকে যখন বিশ্বাস কর
তোমরা. . . একটা জিনিস দেখাচ্ছি. . .,”
ছুরিটা মাটিতে রেখে চামড়ার তেল চিটচিটে
একটাথলে বের করে আনল সে। প্লাস্টিকের
সুতোয় বাঁধা মুখ। বাঁধন খুলল পাপালো।
পাপালো হারকুস: “চোখ বন্ধকর সবাই,”
হাসি হাসি গলায় বলল।
“হাত বাড়াও।”
হাসল তিন গোয়েন্দা। চোখ বন্ধ করে হাত
সামনে বাড়াল।
সবার ডান হাতের তালুতে একটা করে বস্তু রাখল
পাপালো।
পাপালো হারকুস: “এবার চোখখোল !”
অবাক হয়ে দেখল তিন গোয়েন্দা, তিনটে
পুরানো সোনার মোহর।
বুড়ো আঙুলের সাহায্যে চকচকে মুদ্রার ধারটা
পরীক্ষা করল রবিন। ক্ষয়েগেছে। লেখা পড়ল।
রবিন মিলফোর্ড: “ষোলোশো পনেরো !”
চোখ বড়বড় হয়ে গেছে তার।
“এত পুরানো !”
কিশোর পাশা: “স্প্যানিশ ডাবলুন !”
হাতের মোহরটার দিকে চেয়েআছে কিশোর।
“জলদস্যুদের গুপ্তধন !”
মুসা আমান: “ইয়াল্লা ! কোথায়, কোথায় পেয়েছ
এগুলো ?”
কিশোর পাশা: “দশ লাখ ডলার!”
ভুরু কুঁচকে গেছে কিশোরের।
জিম রিভান: “হ্যাঁ,”
অকেজো বাঁ হাত দেখিয়ে বলল জিম।
“ওই টাকার জন্যেই আমার হাতটা গেল . . . ”
কৌতূহলী হয়ে পড়ল তিন গোয়েন্দা। কাহিনীটা
শোনাতে অনুরোধ করল জিমকে।জিম রিভান:
“এক পরিবহন কোম্পানিতে চাকরি করতাম সে
সময়। টাকা-পয়সা কিংবা মূল্যবান জিনিসপত্র এক জায়গা
থেকেআরেক জায়গায় পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব নিত
কোম্পানি। আমি ছিলাম একটাআর্মার কারের গার্ড।
ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে পৌঁছে দিতে হত বিভিন্ন
জায়গায়। কিছু নিয়মিত কাজ ছিল। তার মধ্যে
একটাঃপ্রাইভেট ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিয়ে
মেলভিলেরন্যাশনাল ব্যাংকে জমা দিয়ে আসা। দিয়ে
আসতাম। ঠিকঠাক মতই চলছিল সব। নির্দিষ্ট কোন
একটা পথে চলাচল করতাম না আমরা। আজ এ পথে
গেলে পরের বার অন্য পথে, তারপরের বার
আরেক পথে। নির্দিষ্ট কোন সময়ওমেনে
চলতাম না। ডাকাত লুটেরাকে ফাঁকি দেবার জন্যেই
এই সাবধানতা। কিন্তু তারপরেও একদিন ঘটেগেল
অঘটন . . . ”
জিমের কথা থেকে জানা গেল, ঘটনার দিন, ফিশিং-
পোর্টেরএক ব্যাংক থেকে টাকা নিয়ে
মেলভিলে চলেছিল আর্মার কার। গাড়িতে দু’জন
লোক। ড্রাইভার আর জিম। পথে এক জায়গায় গাড়ি
থামিয়ে দুপুরের খাবার খেতে নামল দু’জনে। গাড়িটা
পথের পাশে পার্ক করে তালা লাগাল সিন্দুকে।
তারপর ঢুকল রেস্টুরেন্টে। বসল গিয়ে জানালার
কাছে, ওখান থেকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল গাড়িটা।
খাওয়া শেষ করে বেরোল দু’জনে। হঠাৎ
পাশের একটা পুরানো সিডান গাড়ি থেকে বেড়িয়ে
এলো মুখোশপরা দু’জন লোক। হাতে রিভলভার।
ড্রাইভারের পায়ে গুলি করল একজন। আরেকজন
বাড়ি মারল জিমের কাঁধে, মাথায়। সঙ্গে সঙ্গে
বেহুঁশ হয়ে পড়ল জিম।
গার্ডের পকেট থেকে সিন্দুকের চাবি বের
করে নিলো ডাকাতেরা। আর্মার কারে উঠে বসল।
গুলির শব্দকানে গিয়েছিল একজন কনস্টেবলের।
ছুটে এলো সে।গুলি করল দুই ডাকাতকে লক্ষ্য
করে। একজনের হাতে গুলি লাগল। গাড়ি নিয়ে
পালিয়ে গেল ডাকাতেরা।
পুলিশ স্টেশনে ফোন করে দিল কনস্টেবল।
সাড়া পড়েগেল। রোড ব্লক করে দিল পুলিশ। কড়া
পাহারা বসে গেল রাস্তায় রাস্তায়।
সাঁঝের একটু পরে পাওয়া গেল গাড়িটা, রক্তাক্ত।
খালি। একটা পরিত্যক্ত বোটহাউসের কয়েক মাইল
দূরে। বোঝা গেল, জলপথে পালিয়েছে
ডাকাতেরা।
মাঝরাতে কোস্ট গার্ডদের পেট্রল বোট একটা
সাধারণ বোটকে ভাসতে দেখল উপসাগরে,
কঙ্কাল দ্বীপের কাছাকাছি। বোটের একজন কি
যেন ফেলছে পানিতে। তাড়াতাড়ি কাছে চলে
এলো কোস্ট গার্ডের বোট। দু’জনলোক
অন্য বোটটাতে। দুই ভাই, ডিক এবং বার্ড ফিশার।
দু’জনেই খুব ক্লান্ত, হাল ছেড়ে দিয়েছে।
বাডের বাহুতে গুলির ক্ষত, রক্ত ঝরছে ! লুট করা
টাকার একটি নোটও পাওয়া গেল না বোটে।জিম
রিভান: “ব্যাপারটা বুঝেছ তো ? নোটের
বাণ্ডিলপানিতে ফেলে দিয়েছিল দুইডাকাত। অনেক
খোঁজাখুঁজি করা হয়েছে পরে, কিন্তু একটা
নোটও আর পাওয়া যায়নি। পানিতে ভিজে নিশ্চয়
গলে-ছিঁড়ে গিয়েছিল কাগজের নোট।”
মুসা আমান: “মহা-হারামী তো ব্যাটারা। ধরা পড়ল
বটে, কিন্তু টাকা ফেরত দিল না। তা ব্যাটাদের
জেলহয়েছিল তো ?”
জিম রিভান: “হয়েছিল। হোভারসনের রিভলভারের
বুলেটে আহত হয়েছে বাড। কিন্তু বমাল ধরা যায়নি,
তাই মাত্র চার বছর করে জেল হয়ে গেল দুই
ভাইয়ের। জেলখানায় ভাল ব্যাবহারের জন্যে
অর্ধেক শাস্তি মওকুফ করে দেয়া হয়েছে
ওদের। ছাড়া পেয়েছে হপ্তা দুয়েক আগে।
কিন্তু আমার হাত আর ফিরে পেলাম না,”
জিমের কণ্ঠে ক্ষোভ।
“কাজও গেল কোম্পানি থেকে।এরপর আর ভাল
কোন কাজ পাইনি আজ পর্যন্ত। ইচ্ছে করে,
ব্যাটাদেরও হাত ভেঙেদিই . . . ”
রাফাত আমান: “এই যে, যাও, বোটে উঠে পড়।
চোখ বুজে নির্ভর করতে পার জোসেফের
ওপর। খুব ভাল ডুবুরি।”
ছেলেদেরকে বোটে তুলে দিয়ে চলে
গেলেন মুসার বাবা।
বোট ছাড়ল জোসেফ গ্র্যাহাম। বেশ বড়সড়
বোট। এক জায়গায় স্তূপ করে রাখা ডুবুরির সাজ-
সরঞ্জাম। ওগুলো দেখিয়ে বলল জোসেফ,
জোসেফ গ্র্যাহাম: “আধুনিকজিনিস। খুব ভাল।
তো, ডুবুরির কাজ কেমন জান-টান?”
মুসা জানাল, প্রাথমিক পরীক্ষায় পাশ করেছে ওরা।
সুরকেল ব্যবহার করতে জানেভালই।
জোসেফ গ্র্যাহাম: “গুড। এ-বি-সি-ডি থেকে
আর শুরু করতে হল না।”
দ্রুত এগিয়ে চলেছে বোট। হলুদ একটা বয়ার
কাছে এসেথামিয়ে দিল জোসেফ। নোঙর
ফেলল।
জোসেফ গ্র্যাহাম: “আমাদেরনিচে একটা ভাঙা
জাহাজ আছে।
না না, কোন গুপ্তধন নেই। ডুবে যাওয়া বেশ
কয়েকটা জাহাজ আছে এদিককার পানিতে। সব ক’টাই
তন্ন তন্ন করে খুঁজেছে ডুবুরিরা। আমাদের নিচে
আছে একটা স্প্যানিশ ইয়ট,অনেক বছর আগে
ডুবেছে। এখানে মাত্র পঁচিশ ফুট গভীর পানি।
নিশ্চিন্তে ডুব দিতে পার। ডিকম্প্রেশনের ভয়
নেই।”
ফেস মাস্ক আর ফ্লিপার পরেনিলো ছেলেরা।
টেনেটুনে পরীক্ষা করে দেখল জোসেফ।
ঠিকমতই পরা হয়েছে। একটা আলমারি খুলে গ্যাস
ট্যাংক, হোস কানেকশন আর ভারি ডাইভিং বেল্ট
বের করল সে।
জোসেফ গ্র্যাহাম:”এখানকার পানি খুব ভাল।
পরিষ্কার, গরম। ওয়েটসুট পরার দরকার নেই।
রবিন, প্রথমে তুমি চল আমার সঙ্গে। সব সময়
কাছাকাছি থাকবে, আলাদা হবে না মুহূর্তের
জন্যেও।বুঝেছ ?”
মাথা কাত করে সায় দিল রবিন।
গ্যাস ট্যাংক বাড়িয়ে দিল জোসেফ।
জোসেফ গ্র্যাহাম: “এগুলো পরে নাও।”
পরে নিতে লাগল রবিন। তীক্ষ্ণ চোখে তার
দিকে চেয়ে রইল জোসেফ।
নাহ্, পরতে জানে ছেলেটা। ভালই শিক্ষা
দিয়েছে ইনস্ট্রাক্টর, ভাবল সে।
বোটের পাশ থেকে ঝুলে আছে দড়ির সিঁড়ি।
সিঁড়ি বেয়ে পানিতে নামল জোসেফ।সাগরের
দিকে পিঠ দিয়ে হাত ছেড়ে দিল সিঁড়ি থেকে।
ঝুপ করে পড়ল চিত হয়ে। ডুবে গেল। তার পর
পরই একই কায়দায় ডুবল রবিন।
ফ্লিপার নেড়ে দ্রুত ডুবেচলল। জোড়া লেগে
গেছে পায়ের ভাঙা হাড়। কোন অসুবিধে হচ্ছে
না সাঁতরাতে। কুসুম গরম পানি। স্বচ্ছ। খুব ভাল লাগছে
তার।
নতুন এক পৃথিবীতে এসে প্রবেশ করেছে
যেন।
নিচে একটা বিশাল কালো ছায়া ! ডুবে যাওয়া ইয়ট।
জোসেফের পাশাপাশি জাহাজটার দিকে নেমে
চলল রবিন।
কাত হয়ে পড়ে আছে ইয়ট। সামনের দিকে বিরাট
এক ফাটল হাঁ করে আছে। আরও কাছে গিয়ে
দেখা গেল, শ্যাওলায় ঢেকে আছে জাহাজের
গা। আশেপাশে সাঁতরে বেড়াচ্ছে ছোট
ছোটমাছ।
রবিনের আগে আগে সাঁতরাচ্ছে এখন
জোসেফ। ফ্লিপার নেড়ে চলে গেল
জাহাজের ওপর দিয়ে, পেছন দিকে।
দুটো বড় গলদা চিংড়ির ওপর নজর আটকে গেল
রবিনের।আরও কাছ থেকে দেখার
জন্যেএগিয়ে গেল। হঠাৎ জোরে ঝাঁকুনি লাগল
পায়ে। থেমেযেতে হল।
কিছু একটা শক্ত করে চেপে ধরেছে তার ডান
পা।
পানির তলায় এই প্রথম বিপদে পড়ল রবিন।
আতঙ্কিতহয়ে পড়ল। জোরে লাথি মেরে পা
ছাড়ানোর চেষ্টা করল। পারল না। চাপ বাড়ল পায়ে।
পেছনে টানছে।
পেছনে ফিরে চাইতে গেল রবিন। ফেস
মাস্কে হাত লেগে গেল নিজের অজান্তেই।
সঙ্গে সঙ্গে যেন অন্ধ হয়ে গেল সে,
সামনের কিছুই দেখা যাচ্ছে না। পানি ঢুকে
পড়েছে মাস্কেরভেতর। উত্তেজনায় ভুলে
গেল, কি করে পানি বের করে দিতে হয়।
হঠাৎ কাঁধ চেপে ধরল কেউ। চমকে উঠল রবিন।
ধরেই নিলো, দানবটা এবার শেষ করতে
এসেছে তাকে।
কিন্তু না, পিঠের ট্যাংকেতিন বার আলতো টোকা
পড়ল। জোসেফ ফিরে এসেছে তাকে উদ্ধার
করতে। শান্ত হয়ে এলো রবিন। উত্তেজনা আর
আতঙ্ক চলে গেল। মনে পড়ল, কি করে পানি
বের করে দিতে হয়।
মাথা ডানে ঘোরাল রবিন। আস্তে করে এক
আঙুলে চাপ দিল মাস্কের বাঁ পাশে। সামান্য ফাঁক হল
মাস্ক। জোরে শ্বাস ফেলল সে। বুদবুদ তুলে
বেরিয়ে গেল বাতাস, সঙ্গে নিয়ে গেল
মাস্কের ভেতরের পানি। আঙুল সরিয়ে আনতেই
আবার জায়গা মত বসে গেল মাস্ক।অন্ধকার সরে
গেল চোখের সামনে থেকে।
প্রথমেই জোসেফের ওপর চোখ পড়ল
রবিনের। এদিক ওদিক মাথা নাড়ছে লোকটা। আঙুল
তুলে পেছনে দেখাল। ফিরে চাইল রবিন।
হায় হায়, এর জন্যেই এত ভয় পেয়েছে সে !
জাহাজের একটা দড়ি পেঁচিয়ে গেছে তার পায়ে।
বাঁকা হয়ে দড়ি ধরল রবিন। খুলে ফেলল পা
থেকে।নিজের ওপরই রাগ হচ্ছে। অযথা
আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। কয়েক ফুট দূরে সরে
গেছে জোসেফ। হয়ত এখুনি ওঠার ইঙ্গিত
করবে।
কিন্তু না, উঠল না জোসেফ। ডান হাতের বুড়ো
আঙুল আর তর্জনীর মাথা এক করে একটারিং তৈরি
করল। দেখাল রবিনকে। তার মানে, সব কিছু
ঠিকঠাকই আছে। পাশে চলে এলো রবিন।দু’জনে
সাঁতরে চলল আবার।পুরো জাহাজের সামনে
থেকে পেছনে একবার সাঁতরাল ওরা।তারপর
চারদিকে এক চক্কর দিল। আশেপাশে ঘোরাফেরা
করছে ছোট ছোট মাছ। ভয় পাচ্ছে না। দু’জন
সাঁতারুকে বড় জাতের কোন মাছ মনে করছে
হয়ত।
অসংখ্য গলদা চিংড়ি দেখতেপেল রবিন।
ইস্, একটা স্পীয়ার গান যদি থাকত সঙ্গে !
কয়েকটাকে ধরে নিয়ে যাওয়া যেত।
আরও কিছুক্ষণ সাঁতরাল ওরা। তারপর ওপরে ওঠার
ইঙ্গিত করল জোসেফ।
ধীরে ধীরে ওপরের দিকে উঠতে লাগল
দু’জনে, কোনরকম তাড়াহুড়ো করল না। মোটর
বোটের তলা দেখা যাচ্ছে, অদ্ভুত কোন দানব
যেন।
ভুস্স্ করে পানির ওপর মাথা তুলল দু’জনে।
দড়ির সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল
জোসেফ। তাকে অনুসরণ করল রবিন।
মুসা আমান: “কেমন লাগল ?”
আগ্রহী গলায় বলল মুসা। হাত ধরে রবিনকে
বোটে উঠতেসাহায্য করল।
রবিন মিলফোর্ড: “ভালই লাগত, কিন্তু গুবলেট
করে ফেলেছি। দড়ি পেঁচিয়ে গিয়েছিল পায়ে।
মাথা ঠিকরাখতে পারিনি।”
বিছানা গোছগাছ করছে মিসেসওয়েলটন। মুসার
বালিশটা টান দিয়ে সরিয়েই স্থির হয়ে গেল।
মিসেস ওয়েলটন: “আরে ! সোনার মোহর !
এটা এলো কোত্থেকে !”
ভুরু কুঁচকে তাকাল কিশোরের দিকে।
“তোমরা খুঁজে পেয়েছ, না? স্কেলিটন
আইল্যাণ্ডে ?”
কিশোর পাশা: “মুসা পেয়েছে।”
কানে বাজছে জোসেফ গ্র্যাহামের হুঁশিয়ারিঃখবরদ
ার ! কেউ যেন জানতে নাপারে !
কিন্তু চেপে রাখা গেল না।ফাঁস হয়ে গেল মুসার
বোকামির জন্যে।
মিসেস ওয়েলটন: “স্কেলিটনআইল্যাণ্ডেই
পেয়েছে তো?”
কিশোর পাশা: “না, উপসাগরে। দ্বীপ থেকে
অনেকদূরে।”
মিসেস ওয়েলটন: “তাজ্জব কাণ্ড ! প্রথম দিন
পানিতে ডুব দিয়েই মোহর পেয়ে গেল !”
কিশোরের দিকে তাকাল। চোখেসন্দেহ।
“লোকের ধারণা, শুটিঙ-ফুটিঙ কিছু না, আসলে
মোহর খুঁজতে এসেছে দলটা। ক্যাম্প করেছে
দ্বীপে। ক্যাপ্টেন ওয়ান ইয়ারের আসল ম্যাপটা
পেয়ে গেছে ওরা কোনভাবে।”
কিশোর পাশা: “হুঁ,”
চিন্তিত ভঙ্গিতে মাথা ঝোঁকাল কিশোর।
সেজন্যেই কি বিরক্ত করা হচ্ছে সিনেমা
কোম্পানিকে। কেউ হয়ত চাইছে, কোম্পানি
দ্বীপ থেকে চলে যাক।
“. . . কিন্তু মিসেস ওয়েলটন, সত্যি বলছি, কোন
ম্যাপ নেই কোম্পানির কাছে। ওরা গুপ্তধন
খুঁজতেআসেনি। ছবি তুলতেই এসেছে।আপনার
এখানে অনেকেই আসে, তাদের ভুল বিশ্বাস
ভেঙে দেবার চেষ্টা করবেন।”
মিসেস ওয়েলটন: “তা করব। কিন্তু আমার কথা
বিশ্বাস করবে বলে মনে হয় না। একবার কোন
কথা ওদের মাথায় ঢুকলে আর সহজে
বেরোতে চায় না।”
কিশোর পাশা: “হ্যাঁ, এই যেমন, নাগরদোলার
ভূতের কথাও বেরোতে চাইছে না। আচ্ছা,
আপনাকে কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করব, জবাব
দেবেন ? সারাজীবন এখানেই বাস আপনার,
এখানকার অনেক কিছুই জানেন।”
মিসেস ওয়েলটন: “নিশ্চয় বলব, যা জানি,”
হাসল মহিলা।
“ঘরটা গুছিয়ে নিই। নিচেওকয়েকটা কাজ আছে।
তুমিও নিচেই চলে এসো। কফি খেতে খেতে
কথা বলব।”
কিশোর পাশা: “ঠিক আছে।”
রবিনের ব্যাগ থেকে ম্যাগাজিনটা বের করে
নিলো।
“আমি যাচ্ছি। আপনি আসুন।”
ড্রইংরুমে এসে বসল কিশোর।পড়ায় মন দিল।
কাজ সেরে এলো মিসেস ওয়েলটন। হাতে
দু’কাপ কফি।
ম্যাগাজিনটা বন্ধ করে পাশে রেখে দিল কিশোর।
হাতবাড়িয়ে একটা কাপ তুলে নিলো।
আরেকটা সোফায় বসে পড়ল মিসেস ওয়েলটন।
মিসেস ওয়েলটন: “হ্যাঁ, এবার কি বলতে চাও।”
কিশোর পাশা: “ওই স্কেলিটনআইল্যাণ্ড। প্রথমেই
বলুন,ওটা ভূতুড়ে হল কি করে ?”
জানা আছে তার, তবু স্থানীয় একজনের মুখে
শুনতে চায়।
খুলে বলল সব মিসেস ওয়েলটন। ফীচারে
লেখা তথ্যের সঙ্গে তার কথা হুবহু মিলে গেল।
একটা কথাজানা গেল, যেটা লেখা নেই। প্লেজার
পার্ক পরিত্যক্ত হবার অনেক বছর পর আবার দেখা
দিতে শুরু করেছে স্যালি ফ্যারিংটনের ভূত !
বেশ ঘন ঘন দেখা যাচ্ছে ইদানীং।
কিশোর পাশা: “জেলেরা, যারা দেখেছে,
তাদেরকে কতখানি বিশ্বাস করা যায়?”
মিসেস ওয়েলটন: “তা সঠিক বলা মুশকিল ! তিলকে
তাল করার অভ্যাস আছে জেলেদের।তবে ওই
তিলটা থাকতেই হবে।আরেকটা ব্যাপার,
স্কেলিটনআইল্যাণ্ডে ভূত আছে, শুধুশুধু বানিয়ে
বলতে যাবে কেন ওরা ?”
কেন বলতে যাবে, কোন ধারণা নেই
কিশোরের। তবে, জেলেরাপুরোপুরি মিছে
কথা বলেছে,এটাও ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না তার।
কিশোর পাশা: “ঠিক ক’বছর আগে থেকে দেখা
দিতে শুরু করেছে স্যালি ফ্যারিংটনের ভূত ?”
মিসেস ওয়েলটন: “সঠিক বলতে পারব না। তবে
বছর দুই-তিন আগে থেকে !
সিনেমা কোম্পানি এলো, ক্যাম্প করল দ্বীপে।
চুরিযেতে লাগল তাদের জিনিসপত্র, কিন্তু চোর
ধরা পড়ল না। ভূতে নিয়ে যায় যেন
জিনিসপত্রগুলো !একেবারে গায়েব ! নাহ্, কিছু
একটা রহস্য আছে দ্বীপটায় ! কি, বলতে
পারবনা !”
কিশোরও মিসেস ওয়েলটনের সঙ্গে একমত।
কিছু একটা রহস্য আছে কঙ্কাল দ্বীপের।
কিন্তু কি সে রহস্য !!
চমৎকার হাওয়া, ফুলে উঠেছেপাল। তরতর করে
এগোচ্ছে ছোট নৌকা। আশেপাশে কোন
নৌকা-জাহাজ নেই। অনেক দূরে দক্ষিণ দিগন্তে
কয়েকটা কালো বস্তু, মাছ ধরা নৌকা।
কঙ্কাল দ্বীপের জেটিতে এসে নৌকা বাঁধল
পাপালো, রবিন আর মুসার অনুরোধ। ডুবুরির
সাজসরঞ্জাম নেবে ওরা। তবে আগে
জোসেফ গ্রাহামের কাছ থেকে অনুমতি নিতে
হবে।
অনুমতি দিল জোসেফ। তাড়াহুড়ো করে চলে
গেল প্লেজার পার্কের দিকে।
মোটর বোটের আলমারি খুলে মুসা বের করল
ফ্লিপার, মাস্ক, গ্যাস ট্যাংক। দু’জনের জন্যে।
পাপালোর দরকার নেই। ওসব সরঞ্জাম ছাড়াই
সাগরে ডুব দিতে অভ্যস্ত সে। কি ভেবে, পানির
তলায় ব্যবহারের উপযোগী দুটো টর্চও নিয়ে
নিলো।
আবার এসে উঠল ওরা নৌকায়। বাঁধন খুলল পাপালো।
আবার নৌকা ছাড়ল।
উজ্জ্বল রোদে ঝিকমিক করছেপানি। ছোট
ছোট ঢেউয়ে তালেতালে দুলছে নৌকা। চুপ
করেবসে থাকতে থাকতে ঝিমুনি এসে গেল দুই
গোয়েন্দার।
গান ধরল পাপালো। ভাষাটা বুঝতে পারল না দুই
গোয়েন্দা। নিশ্চয় গ্রীক। চোখ মেলে চাইল
ওরা। চোখে পড়ল দ্য হ্যাণ্ড, হস্ত। যেখানে
দু’রাত আগে রহস্যজনক ভাবে আটকা পড়েছিল
ওরা।দ্রুত এগিয়ে আসছে বোট। গতি কমছে না
মোটেই। লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল পাপালো।
পাপালো হারকুস: “আরে, পাথরে বাড়ি লাগাবে
তো ! তলা খসাবে !
এ-ই-ই ! বোট থামাও ! বাড়ি লাগবে পাথরে !”
কমল না বোটের গতি। ইঞ্জিনের শব্দে
পাপালোর চিৎকার কানে গেল না হয়ত চালকের।
উঠে দাঁড়াল মুসা আর রবিন।তিনজনে হাত নেড়ে
নেড়ে চিৎকার করতে লাগল, বোট থামাতে বলল।
আরও এগিয়ে এলো বোট। হুইল ধরে রাখা
চালককে দেখা যাচ্ছে। মাথার বড় হ্যাটেরকাণা
টেনে নামানো। চেনা গেল না লোকটাকে।
ছেলেদের চিৎকার তার কানে গেল কিনাবোঝা
গেল না, তবে হঠাৎ বদলে গেল ইঞ্জিনের
শব্দ। গতি কমে গেল বোটের। ব্যাকগীয়ার
দিয়েছে হয়ত।
সাঁ করে ঘুরে গেল বোটের নাক। গতি এখনও
অনেক। কাত হয়ে গেল একপাশে, উল্টেই
যাবে যেন। সোজা হয়ে গেল আবার। তারপরই
ঘটল অঘটন।
বোটের ঠিক সামনেই পাপালোরনৌকা। শেষ
মুহূর্তে নৌকাটা দেখতে পেল বোধহয় চালক।
সরে যাবার চেষ্টা করল কিনা, বোঝা গেল না।
প্রচণ্ড জোরে আঘাত হানল ইস্পাতের তৈরি ভারি
বোটেরনাক, নৌকার মাঝামাঝি। ঢুকে গেল
ভেতরে।
একটা মুহূর্ত এক হয়ে রইল দুটো জলযান !
জোরে গর্জে উঠল মোটর বোটের
ইঞ্জিন। ঝটকা দিয়ে নৌকার ভেতর থেকে বের
করে আনল নাক। মোড় ঘুরে সোজা ছুটল
খোলা সাগরের দিকে।
বোবা হয়ে গেছে যেন ছেলে তিনটে। হাঁ
করে চেয়ে আছে ভাঙা নৌকাটার দিকে।
দ্রুততলিয়ে যাচ্ছে ওটা।
মুসা আমান: “ইয়াল্লা !!
কাপড়-চোপড়, ঘড়ি, সব গেল আমাদের !”
রবিন মিলফোর্ড: “বাড়ি ফেরার পথ বন্ধ !
আটকা পড়লাম এই দ্বীপে ! দ্বিতীয়বার !”
স্তব্ধ হয়ে গেছে পাপালো। কিছুই বলার নেই
তার। মুঠোহয়ে গেছে হাত। বোবা চোখে
চেয়ে আছে সাগরের দিকে।
তার সব আশা সব ভরসা যেন তলিয়ে গেছে ওই
ছোট নৌকাটার সঙ্গে সঙ্গে।
নাক দিয়ে অনবরত পানি গড়াচ্ছে। রুচি নেই। এক
গ্লাস দুধ দিয়ে কোনমতে একটা স্যাণ্ডউইচ গিলে
নিলো কিশোর। তারপর বেরিয়েপড়ল।
বোর্ডিং হাউসের কয়েকটা বাড়ি পরেই ডাক্তার
রোজারের চেম্বার, মিসেস ওয়েলটনকে
জিজ্ঞেস করে জেনে নিয়েছে কিশোর।
রাস্তায় লোকজন কম। কলোনি,টাইপের কয়েকটা
বাড়ি পেরিয়ে এলো কিশোর। রঙ চটেগেছে,
প্লাস্টার উঠে গেছেজায়গায় জায়গায়। কয়েকটা খালি
দোকান পেরল। দরজায় ঝুলছে “ভাড়া দেয়া
হইবে” নোটিশ। পরিষ্কার বোঝা যায়,
ফিশিংপোর্টের সময় খুব খারাপ যাচ্ছে।
আশেপাশের বাড়িগুলোর তুলনায় ডাক্তার
রোজারের বাড়িটা নতুন। লাল ইটের তৈরি, ছোটখাট,
ছিমছাম। ওয়েটিং রুমে ঢুকল কিশোর। দুটো বাচ্চা
নিয়ে বসে আছেএক মহিলা। খানিক দূরে
বসেছে দু’জন বৃদ্ধ, শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে
আছে সামনের দেয়ালের দিকে।
কিশোরের দিকে তাকাল ডেস্কের ওপারে বসা
নার্স।ডাক্তারের চেম্বারের দরজা দেখিয়ে দিল।
সোজা ঢুকে যেতে বলল।
মাঝারি আকারের একা কামরা।এক পাশে একটা ছোট
ডেস্ক। কাছেই একটা বিছানা, ওতে শুইয়ে
পরীক্ষা করা হয় রোগীকে। দু’পাশের দেয়াল
ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটাআলমারি। সাদা রঙ
করা। ওষুধের শিশি বোতলে ঠাসা।
ডেস্কের ওপাশে বসে আছেন ডাক্তার
রোজার। ধূসর হয়ে এসেছে চুল। একটা
স্যাণ্ডউইচ খাচ্ছেন।
ডঃ রোজার: “হ্যাল্লো, কিশোর পাশা,
তোমার জন্যেই অপেক্ষা করছি। এসো,
বসো।”
স্যাণ্ডউইচটা খেয়ে নিলেন ডাক্তার। এক ঢোক
কফি খেয়েউঠে দাঁড়ালেন। বিছানায় গিয়ে শুতে
ইঙ্গিত করলেন কিশোরকে।
দ্রুত অভ্যস্ত হাতে কিশোরের নাক গলা কান
পরীক্ষা করলেন ডাক্তার। গলায় স্টেথো
লাগিয়ে হার্টবিট শুনলেন। টোকা দিয়ে পরীক্ষা
করলেন বুক। তারপর ব্লাডপ্রেশার দেখলেন।
ডঃ রোজার: “হুঁমম,
ঠাণ্ডা লাগিয়েছ ভাল মতই। এখানকার আবহাওয়া সহ্য
হয়নি . . . ”
আলমারি খুলে একটা শিশি বের করলেন ডাক্তার।
একটা ছোট খামে কয়েকটা বড়ি ঢেলেনিলেন।
খামটা কিশোরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
“ভাবনা নেই। চার ঘণ্টা পরপর দুটো করে বড়ি
খেয়ো। দু’দিনেই সেরে যাবে। তবে হ্যাঁ,
নড়াচড়া বেশি করে না, বিশ্রাম নেবে।
সাগরেরধারে কাছে যাবে না।”
কিশোর পাশা: “ঠিক আছে।”
এক মুহূর্ত দ্বিধা করল।
“আচ্ছা, স্যার, আমাকে কয়েকমিনিট সময় দিতে
পারবেন ? কিছু কথা . . . ”
ডঃ রোজার: “লাঞ্চ টাইম,”
কিশোরের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে
আছেন ডাক্তার।
“খেতে খেতে কথা বলতে পারব। ওইটুকু সময়
পাবে।”
ঘুরে ডেস্কের ওপাশে চেয়ারে বসে
পড়লেন আবার তিনি।
“হ্যাঁ, শুরু কর। কি জানতে চাও ?”
কথা শেষে পথে এসে নামল কিশোর। পাশ
কাটিয়ে চলে গেল একটা গাড়ি। ঘ্যাঁচ করে ব্রেক
কষার আওয়াজ হল। পিছিয়ে এলো গাড়িটা।
কিশোরের পাশেএসে দাঁড়িয়ে পড়ল।
হোভারসন: “এই যে, খোকা,”
জানালা দিয়ে মুখ বের করে ডাকলেন পুলিশ
চীফ,
“কোথায় গিয়েছিলে ?”
কিশোর পাশা: “ডাক্তারের কাছে।”
হোভারসন: “কেন ?”
কিশোর পাশা: “সর্দি।”
হোভারসন: “ও।
হ্যাঁ, শুনেছ, হান্টকে ধরতে পারিনি। ব্যাটা
পালিয়েছে।”
কিশোর পাশা: “পালিয়েছে ?”
হোভারসন: “একটা মালবাহী জাহাজে কাজ
নিয়েছে। আজ সকালে ছেড়ে গেছে জাহাজটা।
কয়েক মাসের মধ্যে ফিরবে না। ওর এক
বন্ধুকে ধরেছিলাম। ওই ব্যাটা বলল,গোয়েন্দা
জেনে তোমাদেরকে নিয়ে একটু মজা করছে
হান্ট। আমার কিন্তু বিশ্বাস হচ্ছে না।”
কিশোর পাশা: “আমারও না।”
হোভারসন: “কিন্তু কি আর করা ? ব্যাটাকে তো
ধরতে পারলাম না। ঠিক আছে, চলি। তোমাদের
সঙ্গে যোগাযোগ রাখব। নতুন কিছু জানতে
পারলে জানাব।”
গাড়ি চালিয়ে চলে গেলেন হোভারসন। আবার
বোর্ডিং হাউসের দিকে হাঁটতে লাগল কিশোর।
চিমটি কাটছে নিচেরঠোঁটে . . .
লোকটার ওপর প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ল কিশোর।
পাশের একগলি থেকে আচমকা বেরিয়ে এসে
পথ রোধ করেছে তার। হালকা-পাতলা। কুৎসিত
হাসিতে বিকৃত হয়ে আছে মুখ।
–“এই ছেলে, দাঁড়াও,
তোমাকে কিছু উপদেশ দেব।”
কিশোর পাশা: “নিশ্চয় নিশ্চয়, বলুন কি বলবেন ?”
চেহারা বোকা বোকা করে রেখেছে
কিশোর। ইচ্ছে করলেই চেহারাটাকে এমন
হাবাগোবা করে তুলতে পারে সে। এতে কাজ
দেয় অনেক সময়,দেখেছে।
–“আমার উপদেশ, হাড়গোড় আস্ত রাখতে চাইলে
হলিউডে ফিরে যাও। সঙ্গে নিয়ে যাওসিনেমা
কোম্পানিকে। ফিশিংপোর্টে তোমাদেরকে
কেউ চায় না।”
দু’দিকের কান পর্যন্ত বিস্তৃত হল লোকটার
কুৎসিতহাসি। তার হাতের দিকে চোখপড়ল
কিশোরের। বাঁ হাতের উল্টো পিঠে উল্কিতে
আঁকা ছবি। স্পষ্ট নয়। তবে বুঝতে অসুবিধে হয়
না, ছবিটা জল-কুমারীর। ভয়ের ঠাণ্ডা একটা শিহরণ
উঠে গেল কিশোরের মেরুদণ্ড বেয়ে।
কিশোর পাশা: “ঠিক আছে, স্যার,”
ভোঁতা গলায় বলল কিশোর।
“বলব ওদেরকে। কিন্তু কে যেতে বলছে,
কার নাম বলব ?”
–“বেশি চালাকির চেষ্টা কোরো না, ছেলে,”
কর্কশ গলায় বলল লোকটা।
“ভাল চাইলে আজই ঘরের ছেলেঘরে ফিরে
যাও।”
হঠাৎ ঘুরে দাঁড়াল লোকটা। গট গট করে হেঁটে
আবার ঢুকে পড়ল গলিতে।
লোকটা চলে যাবার পরও কয়েকমুহূর্ত তার গমন
পথের দিকে চেয়ে রইল কিশোর। চেপে রাখা
শ্বাসটা ফেলল শব্দ করে। তারপর আবার হাঁটতে শুরু
করল বোর্ডিং হাউসের দিকে।
একটা ব্যাপারে এখন নিশ্চিত কিশোর।
দ্বীপে সিনেমা কোম্পানির থাকাটা বরদাস্ত করতে
পারছে না কেউ একজন।পাপালো হারকুস: “আমার
নৌকা !”
বিড়বিড় করে বলল পাপালো। জোর করে
ঠেকিয়ে রেখেছে চোখের পানি।
“নৌকা নেই। গুপ্তধন খোঁজার আশা শেষ !”
রবিন মিলফোর্ড: “তাই তো !”
পাপালোর কত বড় ক্ষতি হয়ে গেছে,
এতক্ষণে বুঝতে পারলযেন রবিন।
“কিন্তু একাজ করল কেন লোকটা ? দুর্ঘটনা, নাকি
ইচ্ছে করেই ?”
পাপালো হারকুস: “ইচ্ছে করে !”
রাগ প্রকাশ পেল পাপালোর গলায়।
“নইলে থামত ও। এসে জিজ্ঞেস করত, বোটটা
কার। দুঃখ প্রকাশ করত।”
রবিন মিলফোর্ড: “ঠিকই বলেছ। কিন্তু কেন ?
তোমার নৌকা ভেঙে দিল কেন? কার কি লাভ ?”
পাপালো হারকুস: “আমি মোহরখুঁজে বেড়াই, এটা
লোকের পছন্দ না,”
কাঁদো কাঁদো গলায় বলল পাপালো।
“জেলেরা দেখতে পারে না আমাকে। এই
উপসাগর ওদের। এতে বাইরের কারও ভাগ বসানো
সইতে পারে না।”
[[সূচি পত্র]]
Comments
Post a Comment